আলুর দাম কমে ১৭টাকা বাজারের অবস্থা

আলুর দাম কমে ১৭টাকা বাজারের অবস্থা

বিবিসি ওয়ান নিউজ

নিজস্ব প্রতিবেদন

আমাদের এই আজব দেশে সরকার যদি কোনো পণ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে সেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। ডিম, সয়াবিন, চিনি, পেঁয়াজের পর এবার আলুর ক্ষেত্রেও তেমন চিত্র দেখা গেছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কোল্ডস্টোরেজ থেকে আলু বিক্রি হচ্ছিল ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা কেজি দরে। এর তিন দিন পর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যবসায়ীদের প্রতি কেজি আলু ২৬ থেকে ২৭ টাকা দরে বিক্রির নির্দেশ দেয়। এর পর থেকেই সংকট দেখা দেয়। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, ভোক্তা অধিদপ্তরের নির্দেশিত দামে আলু বিক্রি করলে তাদের ব্যাপক লোকসান হবে।

এর পর থেকে বাজারে আলুর দাম বাড়তে থাকে। অথচ নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার কারণেই সদাশয় সরকার আলুর দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে বিপরীত ফল ফলছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারে লাল আলু ৬০ টাকা আর সাদা আলু ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, যা ২০২০ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ।

চলতি বছর কৃষকরা রেকর্ড ১ কোটি ৪ লাখ টন আলু উত্পাদন করেছেন বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও বাজারে আলুর দাম কমছে না। ফলে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। চালের চাহিদা ও মূল্যবৃদ্ধির কারণে একসময় স্লোগান চালু হয়েছিল, ‘ভাতের বদলে আলু খান চালের ওপর চাপ কমান।’ ভেতো বাঙালি একটু একটু করে আলুমুখী হওয়ার পর এখন আলুতেও টান।

টিসিবির হিসাবে গত বছরের তুলনায় আলুর দাম বেড়েছে ৫৭ শতাংশ। চাল, পেঁয়াজ, সয়াবিন তেলের পর এবার আলুর এ রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধিতে রীতিমতো ভোগান্তিতে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। কিন্তু কেন বাড়ছে আলুর দাম?

আলুর দাম বাড়ার পেছনে অসাধু সিন্ডিকেটের কারসাজি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে অসাধু সিন্ডিকেট। সুযোগ বুঝে তারা বিনা কারণেই আলুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এই চক্র চাল, পেঁয়াজ ও সয়াবিন তেলেরও সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছে। এবার অন্যান্য সবজির দাম বাড়ায় আলু নিয়ে কারসাজি শুরু করেছে। সরকার আলুর দাম বেঁধে দেওয়ার পরও তা কেউ মানছে না। সরকারনির্ধারিত দামে বিক্রেতারা আলু বিক্রি করছে না। এর আগে চাল ও পেঁয়াজের দামও সরকার বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু তা-ও বিক্রেতারা মানেনি। এই ব্যবসায়ী চক্রের কাছে সরকার হলো সার্কাসের জোকার। যাদের কাজ লোক হাসানো।

যাহোক, আলুর সঙ্গে আমাদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। কেবল খাদ্য হিসেবে নয়, শব্দ হিসেবেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আলুর বহুবিধ ব্যবহার লক্ষ করা যায়। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক—কেউ যদি দেখতে নাদুসনুদুস হন, বন্ধুরা তাকে আদর করে ‘আলু’ বলে ডাকেন। আবার কেউ যদি একটু বোকাসোকা হন, তাকেও সবাই ‘আলু’ বলেই ডাকে। কাউকে হুমকি দেওয়া হলে বলা হয়—শয়তান, আজ তোকে মেরে একেবারে আলুভর্তা বানিয়ে ফেলব! ব্যর্থতার ক্ষেত্রে বলা হয়—সে পরীক্ষায় আলু পেয়েছে! ঠিক তেমনিভাবে সতর্কতার ক্ষেত্রে—কি রে, তুই তো দিন দিন একদম আলু হয়ে যাচ্ছিস! কম করে খা ! রূপচর্চার ক্ষেত্রে—হায় হায়, তোমার চোখের নিচে তো কালি পড়ে গেছে। আলু বেটে চোখের নিচে লাগাও! দাম্পত্য কলহের ক্ষেত্রে—তোমার সংসারে এসে আলুভর্তা খেতে খেতে আমার জান তামা তামা! আঘাতের ক্ষেত্রে—ওরে বাপ রে, থামের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আমার কপালে আলু গজিয়ে গেল! ছোটবেলায় আমাদের প্রিয় ছড়া ছিল—রেলগাড়ি ঝমঝম, পা পিছলে আলুর দম! তবে সুস্বাদু হলেও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা সম্ভবত কাউকে আলুভর্তা বানানো!

আলুসংক্রান্ত প্রবাদ-প্রবচনে একটা খটকা আছে। আলু মাটির নিচে হয়। কিন্তু পটোল হয় মাটির ওপরে। সেই দিক থেকে আলু তোলা কঠিন, পটোল তোলা সহজ। কিন্তু আমাদের বাংলা প্রবাদে ‘পটোল তোলা’ বলতে মারা যাওয়া বোঝায়। কিন্তু আলু তোলা বলতে কেবলই আলু তোলা বোঝায়।

আলুর আরো নানা রকম মানে আছে। আছে বিভিন্ন ধরনের প্রয়োগ। আলু বাংলার বিশেষ বিশেষ শব্দের অন্ত্য অঙ্গ, সহজ ভাষায় পাছা। এ যেমন : দয়া + আলু = দয়ালু, ঈর্ষা + আলু = ঈর্ষালু। অনুরূপ—নিন্দালু, নিদ্রালু, ঝগড়ালু, মায়ালু, চোরালু, পোড়ালু। সবজিকে যদি প্রথম আলু ধরা হয়, তাহলে এই শব্দের শেষে বসা দ্বিতীয় আলুও ভালোমন্দ সবখানে চলে।

বাংলা ভাষায় কিছু শব্দ আছে, যেখানে আলু সামনে বসে। যেমন :আলুবোখারা, আলুপুরি, আলুভর্তা, আলুথালু, আলুনি। আলুনিতেও আলু লাগে। আলুনির সঙ্গে আলুর সম্পর্ক নেই, লবণের সম্পর্ক।

এত কিছুর পরও আলুর বদনামের শেষ নেই। আসলে, যে বেশি কাজ করে তার বদনামও বেশি হয়। আরো একটা আলু আছে, যে আলু পরের শব্দের সঙ্গে একটু ফাঁক রেখে বসে। এর নাম আলুর দোষ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, ‘আলুর দোষ’ অর্থ লাম্পট্য, চরিত্রদোষ। কারো চরিত্রে দোষ থাকলে তা আলুর ওপর গিয়ে পড়ে। অনেকে এটাকে পেঁয়াজের দোষও বলে। আলু-পেঁয়াজ এক হলে অবশ্য জম্পেশ আলুর দম হয়ে যায়!

সবাই আলু খায়, এজন্য সবার মধ্যে কমবেশি আলুর দোষ দেখা যায়। আলু কি আসলে খুব খারাপ জিনিস? এজন্যই কি চিকিত্সকরা আলু কম খেতে বলেন? নইলে বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, সর্বপ্রিয় আলুকে লাম্পট্যের কাতারে নিয়ে যাবে কেন? নষ্টামি করে মানুষ, আর দোষ হয় আলু বা পেঁয়াজের। এজন্যই তো তাদের এত দাম!

মানুষের আলুর দোষ থাকতে পারে, আলুর কিন্তু তেমন দোষ নেই। আলুকে বলা হয় ‘কিং অব দ্য ভেজিটেবলস’। এর রয়েছে নানাবিধ মুখরোচক ব্যবহার। ফলে খাদ্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। আর যে জিনিসের বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা, সে জিনিসের দাম তো একটু বেশি হবেই!

আশার কথা হচ্ছে, চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজের দাম নিয়ে মানুষের মধ্যে তেমন কোনো ক্ষোভ নেই। এখন যুগ পালটেছে। এ যুগের ছেলেমেয়েরা চাল-ডাল-আলু-পেঁয়াজ-তেল নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না। তাদের কাছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হচ্ছে—স্মার্টফোন, পাওয়ারব্যাংক, ট্যাব, পামটপ, ব্লুটুথ স্পিকার, নেটফ্লিক্স ইত্যাদি। এখন ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটের যুগ। তার মোহতেই নতুন প্রজন্ম মেতে আছে। চাল-ডাল-আলু-পটোল-পেঁয়াজ নিয়ে ভাবনা করার মতো হাড়-হাভাতের সংখ্যা দেশে আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।

আগে তরুণ-তরুণীরা ‘কৃষিজীবী,’ ‘মত্স্যজীবী,’ ‘শ্রমজীবী’ এসব শব্দের চর্চা করত। আর এখন তারা শুধু ‘সিক্সটিন জিবি,’ ‘থার্টিটু জিবি,’ সিক্সটি ফোর জিবি, হানড্রেড জিবি, থাউজেন্ড জিবি—এসব কপচায়। এখন স্মৃতিশক্তি আর তাদের মাথায় থাকে না, তা এখন ঐ স্মার্টফোনে ঢুকে পড়েছে। যত স্মৃতি সব সেখানে। স্মৃতির আবার পরিমাণও আছে। এই আধুনিক প্রজন্ম নিছক ডাল-ভাত নিয়ে বসে নেই। এরা এখন এআই অর্থাত্ আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স-এর সঙ্গে পাল্লা দিতে লড়ছে।

এখন গ্রামের সংজ্ঞাও বদলে গেছে। ভার্চুয়াল জগতে তারা ‘ইনস্টা’ নামের একটা গ্রাম তৈরি করেছে। সেখানেই তাদের বসবাস, আত্মপ্রদর্শনী। পৃথিবীর তাবত্ বই অর্থাত্ ‘বুক’ বিসর্জন দিয়ে তারা দিন-রাত কেবল ‘ফেসবুক’ চর্চা করে। এরা কথা খুব কম বলে। ওদের লিপি আছে তবুও ওরা চিহ্ন বা ছবি দিয়ে কথা বলে, মনের ভাব প্রকাশ করে। যারা একটু আঁতেল, তারা আবার টুইটার নামে এক নতুন ‘আকাশ’ তৈরি করেছে। তারা সেখানে বিচরণ করে আর দিন-রাত সেখানে ‘টুইট,’ মানে, পাখিদের কিচিরমিচির চলে। তবে আমাদের চেনা কাকলিকূজনের মতো ঠিক নয়।

যারা বড়লোক, যারা ব্যবসায়-বাণিজ্য-প্রশাসন-রাজনীতির মাথা, যারা দেশটা চালায়, সমাজকে, সমাজের হাবা-গোবা-গরিব-মূর্খদের নেতৃত্ব দেয়, তাদের এখন খাবারের কষ্টের চেয়ে খাবার হজম করার কষ্ট অনেক বেশি। তারা খেয়েদেয়ে এতটাই মোটা-পটকা আলু হয়েছে যে, পয়সা খরচ করে আবার মেদ ঝরাতে জিমে যায়। তারা চাল-ডাল-আলু-পটোল খুব একটা খায় না। তারা ফ্রায়েড চিকেন, ডায়েট ড্রিংকস, ওটস, ফ্লেকস, রোল, বার্গার, পিত্জা নামের আজব সব জিনিস খায়! ফলে ডাল-পেঁয়াজ-আলু-চাল মিলল কি মিলল না, তাতে তাদের মোটেও মাথাব্যথা নেই! মানুষ আলুর দম হোক, তাতে কি! তাদের কাছে আলুর মূল্যবৃদ্ধি মানে নিছক আলুরই দোষ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *